[bangla_day], [english_date], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]

হত্যা হুমকি আতঙ্কে মন্দিরে আসেন না পুরোহিত, ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সীমিত

প্রকাশঃ July 30, 2016 | সম্পাদনাঃ 30th July 2016

is

ঢাকা::  দেশে বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন পুরোহিত, সেবায়েত, বৌদ্ধভিক্ষু হত্যা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হুমকির প্রেক্ষাপটে মন্দির ও চার্চে নিয়মিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সীমিত হয়ে আসছে। বেশির ভাগ পুরোহিত ও ধর্মযাজক প্রাণভয়ে বাড়ি থেকে বের হন না। নিরাপত্তার অভাব বোধ করে অনেকেই মন্দিরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। পুরোহিত না আসায় মন্দিরে ভক্তদের আগমন কমে গেছে। একই সঙ্গে অনেক মন্দিরে বন্ধ রয়েছে পূজা-অর্চনা।

তবে পুলিশ বলছে, অরক্ষিত মন্দির ও হুমকি পাওয়া পুরোহিত-সেবায়েতদের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই নিরাপত্তা যথেষ্ট নয় বলে ভয়-আতঙ্কে একরকম ‘বন্দিজীবন’ কাটাচ্ছেন তাঁরা। বিভিন্ন স্থানে পালাবদল করে ২৪ ঘণ্টা পুরোহিতদের পাহারা দিচ্ছে গ্রামবাসী। এরই মধ্যে ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরায় দুই পুরোহিত ও এক সেবায়েত দেশত্যাগ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে লক্ষাধিক মন্দির-চার্চ-গির্জা রয়েছে। এর মধ্যে আট জেলায় প্রায় আড়াই হাজার মন্দির অরক্ষিত ও নিরাপত্তাহীন। এর প্রায় এক হাজার পুরোহিত, ধর্মযাজক-সেবায়েত জঙ্গি হামলার ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত। আগামী অক্টোবর মাসে সর্বজনীন দুর্গাপূজা নিয়েও উদ্বিগ্ন তাঁরা।

এদিকে হিন্দু নেতা-পুরোহিতদের নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট। গতকাল শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।  এ সময়  হুমকিদাতাদের কঠোর শাস্তিসহ চার দফা দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির সভাপতি প্রভাস চন্দ্র রায় এসব দাবি তুলে ধরেন।

রংপুরে প্রায় ২০টি মন্দির ও পাঁচটি চার্চ রয়েছে। এর প্রায় ২৫ জন পুরোহিত ও ধর্মযাজক হুমকি পেয়েছেন। পঞ্চগড়ে ৫০টি মন্দির রয়েছে, তার বেশির ভাগেই নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। একইভাবে পাবনায় ৩২৫ মন্দিরের ২০০ পুরোহিত নানাভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আক্রান্ত। নড়াইল, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, বগুড়া ও ঝিনাইদহে হাজারো মন্দির রয়েছে, যার বেশির ভাগই নিরাপত্তার অভাবে অরক্ষিত। তবে সংশ্লিষ্ট স্থানের পুলিশ প্রশাসন বলছে, মন্দিরে মন্দিরে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। পুরোহিত ও ধর্মযাজকদেরও নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।

গত ৭ জুন ঝিনাইদহের কারাতিপাড়ায় পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলীকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ২১ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের সন্তগৌড়ীয় মঠের পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর দাসাধিকারীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। পাবনায় অনুকূল চন্দ্র ঠাকুরের সেবাশ্রমের এক সেবায়েতকে একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এ ছাড়া ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বেলেখাল বাজারে ছামির আলীকে হত্যা করা হয়। সে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। ১৪ মার্চ কালীগঞ্জ উপজেলায় শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা আবদুর রাজ্জাককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এভাবে ২৩ মার্চ কুড়িগ্রামে ধমান্তরিত হোসেন আলী, ১ মে টাঙ্গাইলে হিন্দু দর্জি নিখিল চন্দ্র জোয়ার্দার, ১৫ মে নাইক্ষ্যংছড়িতে বৌদ্ধভিক্ষু মং শু ইউ, ২৬ মে গাইবান্ধায় হিন্দু ব্যবসায়ী দেবেশ চন্দ্র প্রামাণিক, ৬ জুন নাটোরে খ্রিস্টান দোকানদার, ১১ জুন পাবনায় হিন্দু সেবক নিত্যরঞ্জন পাণ্ডেকে হত্যা করা হয়। আইএস এসব হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বলে সাইট ইন্টেলিজেন্স ‘আমাক’ জানায়।

এ ব্যাপারে গতকাল বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট সভাপতি প্রভাস চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই, তিনি যেন ডিসি-এসপিদের হিন্দু সম্প্রদায়ের কারো ওপর অত্যাচার হলে তাৎক্ষণিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত  বলেন, ‘জঙ্গি হামলার ঘটনায় গত দেড় বছরে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ ২৮ জন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনার পর থেকে তাঁরা শঙ্কার মধ্যে আছেন। যদিও সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমাদের আশ্বস্ত করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। এর পরও আমাদের মনে হচ্ছে সেটা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও গ্রামগুলোতে তেমন নেই।’

রানা দাশগুপ্ত আরো বলেন, ‘গত বছর সারা দেশে ২৬ হাজার মন্দিরে দুর্গোৎসব হয়েছে। আসছে অক্টোবরে সারা দেশে দুর্গাপূজা শুরু হবে। আশা করি, সরকারের তরফ থেকে মন্দিরগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘সারা দেশে জঙ্গি হামলার ঘটনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। কারো ওপর হামলা চালিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

বিস্তারিত আমাদের আঞ্চলিক অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে—

দুই পুরোহিত এক সেবায়েতের দেশত্যাগ : ঝিনাইদহের শৈলকুপার মঠবাড়ী কালীমন্দিরের পুরোহিত সোনা সাধু এবং রামগোপাল মন্দিরের পুরোহিত স্বপন চক্রবর্তী দেশত্যাগ করেছেন। তাঁরা ভারতে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাঁরা ফিরতে পারেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। এদিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা জগন্নাথ দেব মন্দিরের পুরোহিত গোপাল মণ্ডল (৬৫) দেশত্যাগ করেছেন। পাঁচ মাস আগে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনিও ভারতে পাড়ি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সাতক্ষীরা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা।

ঝিনাইদহে ভয়ে মন্দিরে যান না পুরোহিত : ঝিনাইদহের বিভিন্ন মন্দিরের পুরোহিতদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হলেও বেশির ভাগ মন্দির রয়েছে অরক্ষিত। বেশ কিছু মন্দিরে কমিটির লোকজন পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা পুরোহিতকে পাহারা দিচ্ছে। মন্দিরের বাইরে বিয়ে কিংবা কোনো পূজার অনুষ্ঠান হলে সে ক্ষেত্রে পুরোহিতকে গ্রামবাসী ও পুলিশ পাহারায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন মন্দির ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ মদন মোহন রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পুরোহিত মদন গাঙ্গুলী বলেন, ‘ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে। আমাকে নিয়ে পরিবারও রয়েছে চরম আতঙ্কে। সব সময় পুলিশ পাহারায় বন্দি অবস্থায় চলতে হচ্ছে। স্বাভাবিক জীবন বলতে কিছু নেই। এভাবে বেঁচে থাকা যায়  না।’

মেহেরপুরে হচ্ছে না পূজা-অর্চনা : মেহেরপুর জেলা শহরসহ বিভিন্ন মন্দির-আশ্রমের সেবায়েত-পুরোহিতদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক কাটেনি। এ ছাড়া সময় মেনে পূজা-অর্চনাও করতে পারছেন না তাঁরা। ফলে মন্দিরে ভক্তদের আগমন কমে গেছে।

মন্দিরের জিৎ মুখার্জি  বলেন, ‘সূর্যোদয়ের আগেই মঙ্গল আরতি, সকাল ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে বাল্য ভোগ, দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে মধ্যাহ্ন ভোগ, বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বৈকালীন এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে সন্ধ্যা আরতি করার নিয়ম। কিন্তু জঙ্গি হামলার পর থেকে সময়মতো সেই অর্চনাগুলো করা হচ্ছে না।’

মেহেরপুরের পুলিশ সুপার হামিদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জঙ্গি প্রতিরোধে বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন পেশার লোকজনের সঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকে সমাবেশ করা হচ্ছে এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। এ ছাড়া মন্দিরে পুরোহিত ও সেবায়েতরা যাতে স্বাভাবিক পূজা-অর্চনা করতে পারেন সে জন্য মন্দিরগুলোতে পুলিশ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’

সাতক্ষীরার পুরোহিতদের চলাফেরা সীমিত : খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাতক্ষীরা জেলা শাখার নেতা হেনরি সরদার বলেন, ‘আমাদের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আমরা নির্ভয়ে চলাফেরা করলেও আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক।’

সাতক্ষীরা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি গোষ্ট বিহারী মণ্ডল জানান, জেলার আটটি থানা এলাকায় ৫২৭টি পূজা মন্দিরে নিয়মিত পূজা-আর্চনা হয় আর মণ্ডপ আছে ৫৬২টি; যেখানে বছরের বিশেষ বিশেষ দিন পূজা হয়ে থাকে। জেলার ইসকন মন্দিরের পুরোহিতের ওপর হামলা হওয়ার পর নিরাপত্তার খাতিরে সেখানে পূজা-অর্চনা বন্ধ রাখা হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের তথ্য ও গণসংযোগ কর্মকর্তা (ডিবির এসআই) মো. কামাল হোসেন খান জানান, উড়ো চিঠির মাধ্যমে হুমকির ঘটনা দু-একটি ঘটলেও পুলিশ তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসী রুখতে পুলিশের পাশাপাশি লাঠি-বাঁশি কমিটির সদস্যরাও কাজ করছে।

পাবনায় মন্দিরের কার্যক্রম ব্যাহত : পাবনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ভীতিকর অবস্থায় রয়েছে। গত মাসের প্রথম সপ্তাহে সদর উপজেলার শ্রীশ্রী অনুকূল চন্দ্র ঠাকুর আশ্রমের সেবক নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তাঁদের মধ্যে ভীতি আরো বেশি সংক্রমিত হয়েছে। এ অবস্থায় বিভিন্ন মন্দিরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে সম্প্রদায়ের নেতারা জানিয়েছেন।

পাবনা সদর উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সদর উপজেলা শাখার সেক্রেটারি কমল কুমার দাস জানান, জেলার ৯ উপজেলায় প্রায় ৩২৫টি মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পূজা-অর্চনা করে। এর মধ্যে আটটি স্থায়ী মন্দিরে প্রতিদিন তিন বেলা পূজা-অর্চনা হয়। মন্দিরগুলোর দরজা সব সময় ভক্তদের জন্য খোলা রাখা হলেও সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হুমকি, কয়েকটি স্থানে মন্দিরের পুরোহিতদের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে তাঁরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

বগুড়ায় পুরোহিতদের সাবধানে চলাফেরার পরামর্শ : বগুড়া জেলার পুরোহিতদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরই মধ্যে পুলিশ প্রশাসন থেকে পুরোহিতদের ভোরে এবং রাতে সাবধানে চলাচল করার জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্দিরে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

একজন পরোহিত জানান, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের ডেকে সাহস দেওয়াসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চলাফেরায় সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে তাঁদের সাধারণ চলাফেরা বিঘ্নিত হয়ে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।

একটি সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১২টি উপজেলায় প্রায় ৩৫০ পুরোহিত বিয়েশাদি ও পূজা-অর্চনার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এসব দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য তাঁদের দূর-দূরান্তেও যেতে হয়। এঁদের মধ্যে অনেককেই এসব কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। কিন্তু তাঁরা এখন আতঙ্কে দূরে কোথাও যেতে পারছেন না। ফলে অনেকেই অর্থ সংকটে ভুগছেন।

পঞ্চগড়ে আতঙ্ক : পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলা সদরে অবস্থিত সন্তগৌড়ীয় মঠের পুরোহিত (অধ্যক্ষ) যজ্ঞেশ্বর রায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মন্দির-মঠের লোকজনের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রায় সবাই আরো কখন কী ঘটে সেই আতঙ্কে থাকে। জেলার সব মঠ-মন্দিরেই একই অবস্থা বিরাজ করছে।

মঠের অধ্যক্ষ নির্মল চন্দ্র রায় বলেন, সব সময় একটা আতঙ্কে থাকি। সবার মধ্যেই অজানা আতঙ্ক। এ জন্য ভক্ত ও পূজারিদের আনাগোনা কমে গেছে। তাঁর মতে, দেশের যাতে সুনাম ক্ষুণ্ন না হয় সে জন্য আরো বেশি নিরাপত্তা দিয়ে তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া উচিত।

জেলা পুলিশ সুপার গিয়াসউদ্দিন আহমেদ বলেন, মসজিদ, মন্দিরসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়েই পুলিশের কড়া নজরদারি রয়েছে। একটা অঘটন ঘটলেও সবাই স্বাভাবিকভাবে ধর্মীয় আচার পালন করছে। এর পরও অঘটন এড়াতে সাধারণ মানুষকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।

নড়াইল মন্দিরে দেওয়া হচ্ছে পাহারা : নড়াইল সদরের কলোড়া ইউনিয়নের মুশুড়ী গ্রামের ছেলে ঝিনাদহের মধুপুর মঠের সেবায়েত শ্যামানন্দ দাসের নির্মম মৃত্যুর পর থেকেই নড়াইলের সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারগুলোতে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। ১ জুলাই ভোরে পূজার ফুল কুড়ানোর সময় অতর্কিতে তাঁকে হামলা করে মেরে ফেলে দুর্বৃত্তরা।

সরেজমিনে সদরের মুলিয়া, শেখহাটি, আগদিয়া, কলোড়া, শিংগাশোলপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মন্দিরগুলো নিস্তব্ধ হয়ে খাঁ খাঁ করছে, পূজারিরা পূজা-অর্চনা দিতে সকাল-সন্ধ্যা মন্দিরে আসছেন না। আগদিয়ার চর মহাশ্মশান সেবাশ্রম মন্দিরে তালা ঝুলছে। মন্দিরের পুরোহিত উত্তম গোসাই তাঁর সেবাশ্রম বন্ধ করে অন্য স্থানে থাকেন প্রায়ই। তাঁর সঙ্গে কথা হলো গোবরা বাজারে। তিনি বলেন, ‘যেভাবে চারদিকে পুরোহিত-সেবায়েতদের বিনা কারণে হত্যা করা হচ্ছে তাতে এই চিঠি পেয়ে আমরা অত্যন্ত ভীত ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমরা আমাদের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে নড়াইল থানায় জিডি করেছি।’

রংপুরে প্রাণের ভয়ে ধর্মযাজকরা : রংপুরে আইএস পরিচয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল ব্যাপটিস্ট চার্চের ১১ ধর্মযাজক ও একজন পুরোহিতকে। এ ব্যাপারে তাঁরা থানায় জিডিও করেছিলেন। নিরাপত্তাও দিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু এখনো মৃত্যুর ভয় তাঁদের তাড়া করে ফিরছে। ওই হুমকির কথা ভেবে স্বাভাবিক হতে পারছেন না তাঁরা।

এ ব্যাপারে ব্যাপটিস্ট চার্চের প্রধান ধর্মযাজক বার্নাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কারা কেন আমাদের এভাবে হুমকি দিয়ে চিঠি দিয়েছিল তা বুঝতে পারছি না। চিঠি পাওয়ার পর থেকে আমরা আতঙ্কে আছি।’ খবর পেয়ে পুলিশ নিরাপত্তা জোরদার করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তার পরও সেই থেকে মন ভালো নেই। কখন কী হয়—এই ভয় সব সময় তাড়া করে।’

বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের চার দফা দাবি : হত্যার ‘হুমকিতে থাকা’ হিন্দু নেতা ও পুরোহিতদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং হুমকিদাতাদের কঠোর শাস্তিসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট। গতকাল শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

দাবিগুলো হচ্ছে—বাংলাদেশের যেসব হিন্দু নেতা ও পুরোহিতকে বা মন্দিরে হুমকি দেওয়া হয়েছে তাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা এবং হুমকিদাতাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি প্রদান, আসন্ন দুর্গাপূজায় একদিনের পরিবর্তে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা, সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা এবং জাতীয় সংসদে হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য ৬০টি সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা।

এই বিভাগের আরো সংবাদ