[bangla_day], [english_date], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]

সমাধান কী?

প্রকাশঃ April 1, 2016 | সম্পাদনাঃ 1st April 2016

photo-1459441702এই মুহূর্তে যাকে সঙ্গ দিচ্ছেন, কিছুক্ষণ পরই সে আততায়ী হয়ে উঠতে পারে, ধর্ষকের ভূমিকায় যেতে পারে, হয়ে উঠতে পারে একজন ভয়ানক নিপীড়ক। আমি কি আপনাদের বিশ্বাসহীনতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি? লাল-সবুজ নামে পরিচিত যে দেশকে নিয়ে মানুষ স্বপ্ন দেখেন, সেখানে বসবাস করে ইদানীং এই উপলব্ধি হচ্ছে আমার।

বন্ধু হয়ে যে হাতটি বাড়িয়ে দিয়েছিল সে-ই খুন করে পলাতক; এমন সংবাদের শিরোনাম বহুবার চোখে পড়েছে আমার। তোমার চোখেই আমি স্বপ্ন দেখি- মন ভোলানো এমন কথা বলে যে তরুণীর পাশে ঠাঁই পেয়েছিল বিশ কি বাইশ বছরের তরুণ, তিনিও আর প্রেমিক হয়ে উঠেননি, তাকে রক্তাক্ত করেই বাড়ি ফিরেছেন। এমন আস্থাহীনতার সম্পর্ক সংখ্যায় খুবই কম, কিন্তু নিপীড়নের মাত্রাটা যখন বেশি হয়ে ধরা পড়ে তখন মানুষের প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে উঠতে আমাকে বাধ্য করে।

সেদিনও একটি ব্লগে পড়েছি এক তরুণী লিখেছেন, দীর্ঘ সময় ভালোবেসেছেন একজনকে কিন্তু দিনশেষে তাহার প্রেমিকের কাছে শুধু শরীরটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাবলিক বাসে আসন ছেড়ে দিয়ে যে তরুণ ‘মহামানব’ রূপে ধরা দিয়েছিলেন এক তরুণীর কাছে, তার ঘোর কাটতে সময় লাগেনি। কিছুটা পথ পেরুতেই তার হাত তরুণীর মাংসের খুঁজে বেরিয়েছে। চলন্ত বাসে যে তেরো চৌদ্দ বয়সী হেলপার (সহযোগী) হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল মধ্যবয়সী নারীকে, তিনিও আর ‘নিরীহ’ থাকেননি। তিনিও বসে থেকেছেন বাসের ঝাঁকুনির জন্য। যেইমাত্র ঝাঁকুনি দিলো বাস, অমনি তিনি হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন মধ্যবয়সী নারীর ওপর। কেউ থাকে সকালের সোনালি রোদের অপেক্ষায়, কেউ যে বাসের ঝাঁকুনির অপেক্ষায়ও থাকেন সেটা আমলে নিতেই হবে! আহা! জীবন কত বিচিত্র! পাবলিক বাসের সংরক্ষিত আসনের মতো নারীর শরীরের কিছুটা অংশ পাবলিক বাসের পুরুষদের জন্য বরাদ্দ রাখলে ক্ষতি কী! দিনশেষে কাউকে তো আর ঝাঁকুনির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। এমন দেহদানমনা নারী আমরা কোথায় পাই?

পত্রিকা কিংবা ব্লগে অনেক নারী বন্ধুকেই দেখছি উনারা ধর্ষণ প্রশ্নে লিখেন- ধর্ষকদের কি মা, বোন নেই? এইগুলো খুবই ঠুনকো যুক্তি। পৃথিবীর প্রত্যেকটি সম্পর্কই রাজনৈতিক সম্পর্ক-এটা আমি মনে করি। অনেক নারীবাদিরাই এটা বলে গেছেন, এখনো বলছেন। আপনাকে কোন অবজেক্ট হিসেবে একজন ধর্ষক ভাবছে, সেটাই মুখ্য বিষয়। সমাজ আপনাকে কীভাবে দেখছে, এর বাহিরে একজন ধর্ষক আপনাকে দেখবে, এটা ভাবেন কীভাবে? তাই মা-বোনের প্রসঙ্গ টেনে ধর্ষকদের হাত থেকে যে বাঁচতে পারবেন না, এটা নিশ্চিত। ধর্ষণের বেলায় দিনশেষে ধর্ষকদের কোনো মা-বোন নেই, ধর্মও নেই। তার ভাবনায় শুধু আপনার শরীর, ব্যস ওটুকুই।

ভারতে ধর্ষণের ঘটনায় কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী বলেছিলেন, ‘অব্যাহত ধর্ষণ ও নারীদের নিপীড়নের ঘটনায় লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে আসে।’ [ভারতীয় দৈনিক দ্য হিন্দু, ০৯/০৩/২০১৩] সোনিয়া গান্ধীর মাথা লজ্জায় হেঁট হয়ে এলেও ভারতে ধর্ষণকারীরা থেমে যায়নি। ধর্ষণে তারা নিজ দেশ তো বটেই বিদেশিনীদেরকে জয় করে নিয়েছে!

সম্প্রতি লক্ষ করলাম আমাদের নারীরা (মানুষেরা), পুরুষেরা (মানুষেরা) তনু হত্যার বিচার চান। যে রাষ্ট্রে অনেক নারী (মানুষ) এরইমধ্যে ধর্ষিত হয়েছেন সেই রাষ্ট্রের কাছে বিচার চান। যে রাষ্ট্রের অনেক ধর্ষিত নারী এখনো বিচার পাননি সেই রাষ্ট্রের কাছে চান। তারা শুধু বিচার চান। কেউ ফাঁসি চান। কেউবা ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কর্তন চান। আরো অনেক বিচিত্র শাস্তি তারা চেয়ে থাকেন। বিভিন্ন ব্লগে দেখেছি, অনেকেই ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে পুরুষাঙ্গ কর্তনকেই পছন্দের তালিকায় রেখেছেন। মনে হচ্ছে যত সমস্যা সব পুরুষাঙ্গে! আর তাই এই ‘ভয়ানক’ অস্ত্রটাকে কর্তন করলেই মুশকিল আসান!
যদি আমি ভুল না করি তাহলে আমার ধারণা, মানুষ ক্ষোভ থেকে ধর্ষকদের পুরুষাঙ্গ কর্তন করতে চায়। যেহেতু অধিকাংশ মানুষ শিশ্নকেই শক্তি মনে করে থাকেন, তাই তাঁরা হয়তো মনে করেন এই শক্তির বিনাশ হলেই ধর্ষণ নির্মূল হবে।

আচ্ছা এরপর কী হবে? কেউ কী বলতে পারেন? সব ধর্ষককে ধরে ধরে শাস্তি দিলেই কী ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে? মস্তিষ্কে যে কূপমণ্ডুক মানসিকতা ধারণ করে আছেন ধর্ষকরা, সেটা কী নিপাত যাবে? আমি মনে করি, একজন মেয়ে জন্মাবার পর থেকে সমাজ যেভাবে তাকে সংজ্ঞায়িত করছে, সেই সংজ্ঞায়ই লুফে নেয় ধর্ষকরা। সমাজ এখনো নারীকে যৌনবস্তু হিসেবেই ভাবে। রমণী নামের যে শব্দটি নিত্যদিন আমরা ব্যবহার করছি, তার সহজ অর্থ- যাকে রমণ করা হয়, তিনিই রমণী। এই ভাবনার বাইরে কি আমরা যেতে পেরেছি? এজন্য সবার আগে প্রয়োজন মনুষত্ববোধ এবং মানবিকতার চর্চা।
অর্থাৎ আমি একটি নৃশংসতম ঘটনার বিচার আরেকটি নৃশংসতম ঘটনার মাধ্যমে চাই না। আমি চাই পৃথিবীর সব খুনিরা, ধর্ষকরা, নিপীড়করা বুকভরে নিঃশ্বাস নিক। তাদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একজন মানুষ তিনি যেই হোন তার মৃত্যু আমি কামনা করতে আমি পারি না। আমি চাই নিপীড়ক মানুষটি যেন স্বাভাবিক জীবন লাভ করে। জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে হলেও সে ভাবুক তার চিন্তা ভুল ছিল। দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার পরও যেন সে ভাবে, তার যাত্রা ভুল ছিল, তার হাত ভুল জায়গায় ছিল, ঠোঁট, চোখ, মুখ সবই ভুল পথ অনুসরণ করেছিল। এই ভাবনা এমনি এমনি আসবে না। এই সুযোগ তৈরি করতে হবে রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্র কী এমন একটি মানবিক সমাজ তৈরি করতে পারবে?

প্রিয় পাঠক, আমাকে কি ধর্ষকবান্ধব মনে হচ্ছে? কারো মনে হতে পারে, তবে সত্যিকার অর্থেই আমি একটি মানবিক সমাজ চাই। যেখানে সবার একটিই পরিচয়, সেটি হচ্ছে মানুষ। আমি মনে করি, নারীর সম্মান নারীদেহে আটকে থাকে না। আর তাই একজন ধর্ষক নারীর ওপর হামলে পড়লেই তাকে আত্মহত্যা করে মরে যেতে হবে- এমন ভাবনার সঙ্গে আমি একমত নই। জন্ম যেহেতু একবার হয়েছেই আসুন না লড়তে শিখি।

লেখক : সহ-সম্পাদক, জাগোনিউজ ২৪ডটকম

এই বিভাগের আরো সংবাদ