[bangla_day], [english_date], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]

বৃক্ষমানব এর পিতা ক‌ে ঢাকায় আনা হচ্ছে উন্নত চিকিৎসার জন্য

প্রকাশঃ March 9, 2016 | সম্পাদনাঃ 1st April 2016

নিউজ ডেস্ক : বিরল রোগে আক্রান্ত বৃক্ষমানব তাজুল ইসলাম ও তার শিশুপুত্র রুহুল আমিনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বুধবার ঢাকায় নেয়ার কথা জানিয়েছেন পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মাজহারুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-১ মো. জাহাঙ্গীর আলম বুলবুলের নির্দেশে তাজুল ইসলামের পরিবারকে ঢাকায় নেয়া হচ্ছে বলে জানান মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিরল রোগে আক্রান্ত বৃক্ষমানব পরিবারের সদস্যদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এদিকে ‘এবার রংপুরে বৃক্ষমানব পরিবারের সন্ধান’ শিরোনামে গত ৬ মার্চ দেশের অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি সর্বত্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অফিস এমনকি চায়ের দোকানেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় বৃক্ষমানব বাবা-ছেলের খবরটি।
সংবাদ প্রকাশের পরের দিন সোমবার দুপুরে বিরল রোগে আক্রান্ত রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর কালসারডাড়া গ্রামের তাজুল ইসলাম (৪৮) ও তার ছেলে রুহুল আমিনের (১০) পরিবারকে সহযোগিতা করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়। এছাড়াও সমাজসেবা অফিস ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সকল কার্যালয়সহ ইসলামী ব্যাংক ও সাহায্য সহযোগিতা প্রদানকারী সংস্থাও ওই পরিবারটির খোঁজ-খবর নেয়া শুরু করেছেন।
মঙ্গলবার বিরল এ রোগে আক্রান্ত তাজুল-রুহুলের পরিবারের ৩ সদস্যকে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে পীরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও ইউপি চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করা হয়।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও, অর্থোপেডিকস্ বিশেষজ্ঞসহ চিকিৎসকরা বৃক্ষমানব পরিবারের বাবা-ছেলেসহ তিনজনকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এ সময় তাদের মধ্যে ‘বৃক্ষমানব’ প্রকৃতির হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাস’ সনাক্ত করা হয়। তবে বিরল এ রোগটি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে বুধবার তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-১ মো. জাহাঙ্গীর আলম বুলবুলের নির্দেশে এদের ঢাকায় নেয়া হবে বলে জানা গেছে।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের আব্দুল্লাহ্পুর গ্রামে আফান মুন্সি এ রোগে তার হাত ও পা আক্রান্ত হয়। তার ঘরেই জন্ম নেয়া দুই ছেলে বাছেত মিয়া ও তাজুল ইসলাম এবং মেয়ো সাফিয়া খাতুন।
তারা তিনজনই জন্মের পর থেকে হাত-পায়ে গাছের শিকড়ের মতো গজাতে থাকা এ বিরল রোগে আক্রান্ত হয়। এ ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে ৯ বছর বয়সে তাজুল ইসলামের একমাত্র বোন সাফিয়া প্রায় ১০ বছর আগে মারা যান। এরপর তাদের বাবা আফান মুন্সিও মারা যান ৭৫ বছর বয়সে।
এদিকে, এ রোগে আক্রান্ত তাজুল ইসলামের ২ সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে রুবেল মিয়া জন্মের পর সুস্থ স্বাভাবিক হলেও ছোট ছেলে রুহুল আমিন জন্মের পর থেকেই হাত ও পায়ে এই রোগে আক্রান্ত হয়।
দরিদ্র এ পরিবারের পক্ষে শুরু থেকেই শুধু ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেই চিকিৎসা কাজ শেষ করেছেন। ততদিনে বাড়তে থাকে তাদের হাত-পায়ের নখ ও তালুর চামড়া-মাংস। এক পর্যায়ে শক্ত হয়ে যায়। পরে হাত-পায়ের বর্ধিত শক্ত অংশ কাটতে গেলেই বেরিয়ে আসতে থাকে রক্ত।
এদিকে, সংসারের বোঝা টানতে তাজুল ইসলাম রুহুল আমিনকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি পেশা বেছে নেন। এরই মধ্যে রুহুল আমিন রাধাকৃষ্ণ পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হলে প্রধান শিক্ষক সেকেন্দার আলী তাকে স্কুল থেকে বের করে দেন। পরে রুহুলকে চকফুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২য় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। এখনো তার পড়লেখা চলছে বলে জানা গেছে।
রুহুল আমিন জানান, ‘মোক আগের স্কুল থাকি বাইর করে দেয়ার পর চকফুলাত ভর্তি হচু। হামার বাড়িত থাকি স্কুল ১ কিলো দূরোত হয়। পায়োত হাঁটিই কষ্ট করি খোড়ে খোড়ে যাও। মাজে মদ্যে ভ্যানোতও চড়ি যাও।’
এ সময় রুহুল আমিন তার বাবার সঙ্গে ভিক্ষা করেন বলেও জানান। রুহুলের ডান চোখের নীচে ও ভ্রুর উপরে এবং কপালের বেশকিছু অংশে গাছের পাতার মতো নীলিমা-কালচে রং ধরে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিরল এ রোগে আক্রান্ত তাজুলের বড় ভাই বাছেত মিয়া বলেন, ‘জন্মের পর থাকিই অসুখটা হছে। সারারাত বিষের ব্যথাত কান্দাকাটি করি কষ্টে আইত পার করো। হাত দি ধরবার পারো না। চামুচ দিয়া ভাত খাও। জেবোনে কোনো দিন গোস্ত খাও নাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিষের জ্বালায় দেড় বছর আগে মোর দুই পা’ রংপুর উত্তম সেবা ক্লিনিক থাকি কাটি নিয়া আসছো। অ্যালা পায়োত বিষ ব্যতা নাই। হাতোত একনা ব্যতা আছে। কিন্তুক মাজে মদ্যে কাটা পায়োত কিটকিট করি ব্যতা করে বাহে’।
এ ব্যাপারে অর্থোপেডিকস্ বিশেষজ্ঞ এনামুল বাশার বলেন, ‘আপততঃ বিরল রোগটিকে ‘বৃক্ষমানব’ প্রকৃতির হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাস’ ভাবছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কিছুই বলা সম্ভব না। এটি পৃথিবীতে পঞ্চম রোগী পাওয়ার ঘটনা। তাও আবার একই পরিবারের ৩ জন। আমরা তাদের ভর্তি করে নিয়ে শুধু ব্যথানাশক ওষুধ প্যারসিটামল দিচ্ছি।’
অপরদিকে, রামনাথপুর ইউপির চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমি তাজুলকে একটি হুইল চেয়ার দিয়েছি।’
পীরগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘বিরল এ রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। এজন্য একটি ফান্ড গঠন করা প্রয়োজন। আমরা সমাজসেবা বিভাগের অধীনে সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করবো। পাশাপাশি বাছেত মিয়া ও তাজুল ইসলামকে পঙ্গুভাতা দিচ্ছি। বাছেতকে একটি হুইল চেয়ার দেয়া হয়েছে। আগামীতে শিশু রুহুল আমিনকেও পঙ্গুভাতা দেয়া হবে।’

এই বিভাগের আরো সংবাদ