[bangla_day], [english_date], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]

রংপুর শহরের সৌন্দর্যবর্ধন করে চলেছে তাজহাট জমিদার বাড়ি।

প্রকাশঃ May 28, 2016 | সম্পাদনাঃ 28th May 2016

অভিজিৎ রায়: গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে রংপুর শহরের সৌন্দর্যবর্ধন করে চলেছে তাজহাট জমিদার বাড়ি। রংপুর জাদুঘর নামে রূপান্তরিত এই বাড়িটি প্রতিদিন শত-শত দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। বাড়িটিকে ঘিরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রয়েছে একটি মহাপরিকল্পনা।

এই জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মো. আবু সাঈদ ইনাম তানভিরুল জানান, এই জমিদার বাড়িকে ঘিরে একটি মহাপরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে।

তাজহাট জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন জমিদার মান্নালাল রায়। তিনি ভারতের পাঞ্জাব থেকে এসেছিলেন। প্রথম দিকে পেশায় ছিলেন একজন স্বর্ণকার। স্বর্ণখচিত টুপি কিংবা তাজ নির্মাণ করায় এই অঞ্চলের নাম হয়েছে তাজহাট। ব্রিটিশ শাসনামলে তিনি পুরো একটি পরগণা কিনে নিয়ে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তার মৃত্যুর পর জমিদারির দায়িত্ব পান পুত্র গিরিধারী লাল রায়।

তাজহাটের জমিদার বংশের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন গিরিধারী লাল রায়। ১৮৯৭ সালে তার মৃত্যু হলে পুত্র গোবিন্দ লাল রায় জমিদারি লাভ করেন। জমিদার গিরিধারী লাল রায় ছিলেন প্রজাহিতৈষী ও দানশীল। এ জন্য তিনি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ১৮৮৮ সালে রাজা, ১৮৯২ সালে রাজা বাহাদুর ও ১৮৯৬ সালে মহারাজা উপাধিতে ভূষিত হন। এই সময়টিই ছিল তাজহাটের জমিদারদের সোনালী অধ্যায়। পরে জমিদার গোবিন্দ লাল রায়ের মৃত্যু হলে তার পুত্র গোপাল লাল রায় জমিদার নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন এই বংশের শেষ জমিদার। তিনিও ১৯১২ সালে রাজা ও ১৯১৮ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক রাজাবাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে গোপাল লাল রায়ের বংশধররা ভারতে চলে যান। ১৯৫২ সালের পর বাড়িটি চলে যায় কৃষি বিভাগের অধীনে। এখানে গড়ে ওঠে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাড়ির অনেক মূল্যবান সম্পদ খোয়া যায়।

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, মান্না লাল রায় জাতি হিসেবে ক্ষত্রিয় হলেও শিখ ধর্মের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সঙ্গে শিখদের সংঘাতের সময় তিনি পাঞ্জাব থেকে পালিয়ে রংপুরের মাহিগঞ্জে বসতি স্থাপন করেন। এখানে তিনি হীরা, মনি ও মুক্তাখচিত টুপি (তাজ) বিক্রি করতেন।

রংপুর শহর থেকে পূর্বদিকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থান তাজহাট জমিদার বাড়ির। ৫৬ একর এলাকাজুড়ে এই কমপ্লেক্সটি। পূর্বমুখী দোতলা এই বাড়িটির সামনের দিকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৭ মিটার। বাড়ির সামনের দিকে রয়েছে বড় একটি দরদালান। এতে ওঠার জন্য রয়েছে শ্বেতপাথরে আবৃত দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি। বাড়ির ছাদের মূল অংশে আট কোণা পিলারের ওপর অবস্থিত রেনেসাঁ গম্বুজ। এ গম্বুজের বৈশিষ্ট্য হলো, এটি আংশিকভাবে সরু পিলারের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাড়িটিতে গাড়ি রাখার বারান্দা প্রায় ১০ মিটিার দীর্ঘ। এর ওপরে যে ঝুল বারান্দা রয়েছে, তার ছাদ চারটি পিলারের ওপর অবস্থিত। দুই প্রান্তের বারান্দায়ও রয়েছে ত্রিকোণাকৃতির ছাদ।

তাজহাট জমিদার বাড়ির নকশা অনেকটা ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের মতো। বাড়িটিতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে চোখ পড়ে ১৯ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ১৪ মিটার প্রস্থের বিশাল হলঘর। এর দুই দিকে রয়েছে একটি করে ঘর। ভেতরে আছে তিন মিটার প্রশস্ত টানা বারান্দা। প্রধান ফটকের উত্তর দিকের দোতলায় বিশাল একটি কাঠের সিঁড়ি রয়েছে। পুরো ভবনে আছে মোট ২২টি ঘর।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের সময় ভবনটির অংশবিশেষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণের পর গোপাল লাল রায় বর্তমানে যে ভবনটি রয়েছে তার নির্মাণ কাজ শুরু করেন। কাজ শেষ হয় ১৯১৭ সালে। ইতালি থেকে আমদানিকৃত শ্বেতপাথর দিয়ে তৈরি করা হয় বাড়ির সামনের অংশের সিঁড়ি। ভবনের সামনে মার্বেল পাথরের সুদৃশ্য একটি ফোয়ারা আজও বিদ্যমান।

১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তাজহাট জমিদার বাড়ি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোট বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৯৫ সালে এটিকে প্রত্মসম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০০২ সালে এটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। এখন নাম রংপুর জাদুঘর। বর্তমানে এটি ১৬ দশমিক ০৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাকি জমিতে কৃষি ইনস্টিটিউট করা হয়েছে। এই জাদুঘরে তিনশর বেশি মূল্যবান নিদর্শন রয়েছে। প্রতিদিন দেশি ও বিদেশি পর্যটকরা এই বাড়ির সৌন্দর্য দর্শনে আসেন। প্রবেশমূল্য বড়দের ১০ টাকা, শিশুদের ৫ টাকা। বিদেশী পর্যটকদের জন্য প্রবেশমূল্য ২০ টাকা।

এই বিভাগের আরো সংবাদ