[bangla_day], [english_date], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]

হঠাৎ পাশের রুম থেকে বড় ভাইয়েরা এসে বললো জঙ্গি হামলা,প্রত্যক্ষদর্শী

প্রকাশঃ July 26, 2016 | সম্পাদনাঃ 26th July 2016

Feature Image

 

ঢাকা : আমরা ৪র্থ তলায় থাকি, জঙ্গিরাও ৪র্থ তলায় থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গিদের রুম থেকে আমাদের রুমের ব্যবধান ৫-১০ হাত। এসময় হঠাৎ পাশের রুম থেকে বড় ভাইয়েরা এসে বললো জঙ্গি হামলা।’

সোমবার রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরের ৫ নম্বর রোডের ৫ নম্বর ভবনের চার তলায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের এ বর্ণনা দিয়েছেন শামসুল আলম নামে একজন সাংবাদিক।

শামসুল রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে প্রকাশিত ‘ঢাকা প্রতিদিন’ নামের একটি দৈনিকে সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

সোমবার রাতে জঙ্গি বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকেই সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাসে ঘটনার হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেন তিনি।

সর্বশেষ মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৮টায় এক স্ট্যাটাসে শামসুল লেখেন, ‘ঘটনা শুরু রাত সাড়ে ১২টার দিকে। আমাদের বিল্ডিংয়ের তিন তলা থেকে এক নারী ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করতে থাকে। এরপর আমরা এবং আশেপাশের বিল্ডিং থেকেও ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করতে থাকি।

স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, হঠাৎ স্লোগান, ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার’ ভাবলাম মনে হয়ে চোর ধরা পড়ছে। চোর দেখতে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এসময় কয়েবার বিকট শব্দ হলো। একজনের বক্তৃতার আওয়াজ পেলাম। ‘দুনিয়া যার আইন চলবে তার’, ‘ইসলামের শত্রুরা নিপাত যাক’, ‘তোমরা কাফের, মুশরিক’, ‘তোমরা জাহান্নামি’।

এরপরের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শামসুল আলম লেখেন, ‘আমরা ৪র্থ তলায় থাকি, জঙ্গিরাও ৪র্থ তলায় থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গিদের রুম থেকে আমাদের রুমের ব্যবধান ৫-১০ হাত। এসময় হঠাৎ পাশের রুম থেকে বড় ভাইয়েরা এসো বললো জঙ্গি হামলা। এরপর সব নিঃস্তব্ধ। শুধু জঙ্গিদের স্লোগান আর গুলির শব্দ।’

তিনি লেখেন, ‘১০-১৫ মিনিট পর পর জঙ্গিদের স্লোগান আর গুলির শব্দে রাত পেরিয়ে ভোর ৬টা। এরপর শুরু হলো বৃষ্টির মতো মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। জানতে পারলাম ৯ জন জঙ্গিই মারা গেছে। অভিযান সমাপ্ত।

তবে অভিযানের পরেও গুলির শব্দ শোনা যায় বলে দাবি করেন শামসুল। তিনি লেখেন, ‘কিন্তু অভিযান সমাপ্তির আধাঘণ্টা পরও প্রায় ১০-১৫ রাউন্ড গুলির শব্দ পেলাম।’

অভিযানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভীতিকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তিনি লেখেন, ‘কী যে আতংক আর উদ্বেগের মধ্যে রাতটা গেল আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা সুস্থ আছি। তবে এঘটনা এখানেই শেষ না। আমাদের বিল্ডিংয়ের সব ফ্লাটেই বাহির থেকে তালা দেয়া। রুম থেকে বের হতে পারছি না। পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য আপনাদের দোয়া প্রার্থনা করছি।’

ভবনটির চার তলার আরেক বাসিন্দা ও শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ২য় সেমিস্টারের ছাত্র আশিকও সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার একই রকম বর্ণনা দিয়েছেন।

আশিক বলেন, ‘জাহাজ বাড়িটি ৬ তলা। প্রতি তলায় ৪টি করে ইউনিট। আমরা থাকি ৪ তলায়। আমাদের রুমে থাকে ৯ জন। রাতে আমাদের রুমে ছিল ৭ জন। রাতে বাইরে ছিল ২ জন। পরপর তিনটি গুলির শব্দের পর আমার ঘুম ভাঙ্গে। ভয়ে তখন থরথর করে কাঁপছিলাম। ঘটনার সময় মনে হচ্ছিল আমাদের পাশের রুমে গোলাগুলি হচ্ছে। ভয়ে আমি এক বড় ভাইয়ের রুমে চলে যাই।’

এদিকে ওই বাড়িতে অভিযানের পরপরই সাংবাদিক শামসুল আলম ফেসবুকে ঘটনার আপডেট দিতে শুরু করেন। সর্ব প্রথম রাত সোয়া ১টায় তিনি লেখেন, ‘ ইয়া আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। আমরা খুব বিপদে আছি। কল্যাণপুর ৩ নম্বর রোডে। চার পাশে শুধু জঙ্গিদের স্লোগান আর মুহুর মুহুর গুলি।’

সাত মিনিট পর রাত ১টা ২২মিনিটে তিনি আবার লেখেন, ‘আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমরা খুব বিপদে আছি। শুধু গুলি আর গুলি, জঙ্গিদের স্লোগান। কল্যাণপুর ৩ নম্বর রোড। জানি না বাহিরে কি হচ্ছে।

পরে রাত ১টা ৫৪ মিনিটে তিনি লেখেন,’আল্লাহ আমাদের রক্ষা কর। আমরা প্রশাসনকে একাধিকবার জানাচ্ছি, তারা শুধু বলছে তারাও নাকি অপারেশনে আছে। কিন্তু আমরা শুধু জঙ্গিদেরই আওয়াজ শুনছি।’

এরপর রাত ৪টা ১৮ মিনিটে শামসুল লেখেন, ‘সর্বশেষ ৩.১৭ মিনিটে জঙ্গিদের স্লোগান আর গুলির শব্দ শুনেছি। এখন নিঃশব্দ। প্রশাসন বা জঙ্গি, কোনও পক্ষেই আওয়াজ নেই। সম্ভবত আমাদের বাসার গেট ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমাদের বাসায় সম্ভবত প্রশাসন অবস্থান করছে। তবে ১০০% বলতে পারছি না। কিছু সূত্রে জানতে পারলাম সকাল প্রশাসনের অভিযান চলবে। জানি না কি হয়। সবার কাছে দোয়া চাই। আমাদের জন্য দোয়া করুন।’

মঙ্গলবার সকাল ৭টা ১ মিনিটে শামসুল লেখেন, অভিযান চলছে, চলছে প্রশাসন আর জঙ্গিদের মুহুর্মুহু গুলি এবং জঙ্গিদের স্লোগান। সকাল ৭টা ৫৩ মিনিটে তিনি আরও লেখেন, ‘ অভিযান সমাপ্তি ঘোষনার পরও মুহুর্মূহু গুলির শব্দ শুনছি। আতঙ্ক কাটছেই না।’

এদিকে মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৬টার দিকে ওই ভবনে ওই ভবনে পুলিশ ‘অপারেশন স্টর্ম ২৬’ নামের এই অভিযান চালায় বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান।

তিনি জানান, পুলিশের সঙ্গে এ অভিযানে অংশ নেয় স্পেশাল উইপনস অ্যান্ড ট্যাকটিকস (সোয়াট), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল।

এ অভিযানে গোলাগুলিতে নয় ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযান শেষে সকাল ৮টার দিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহীদুল হক বলেন, নিহতরা সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য।

(স্বাধীনতা৭১ডটকম/এআর)

এই বিভাগের আরো সংবাদ