[bangla_day], [english_date], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]

কোজাগরী পূর্ণিমার শুভ তিথিতে দেবী লক্ষ্মীপূজার সহজ বিধি

প্রকাশঃ October 2, 2017 | সম্পাদনাঃ 2nd October 2017

 

স্বাধীনতা ৭১ ডেস্ক:  লক্ষ্মী দেবীর ধ্যান মন্ত্রে বলা হয় “ যাম্য করে পাশ , অক্ষমালা , সৌম্য করে পদ্ম ও অঙ্কুশ ধারিনী পদ্মাসনে উপবিষ্টা , শ্রী অর্থাৎ ঐশ্বর্য সম্পৎ ও সৌন্দর্য রুপিনী , ত্রিলোকের জননী , গৌরবর্ণা , সুন্দরী , সর্বা অলঙ্কার বিভূষিতা , ব্যগ্রহস্তে স্বর্ণ পদ্ম ধারিনী এবং দক্ষিণ হস্তে বরদানকারিনী দেবীকে ধ্যান করি ।

লক্ষ্মী স্ত্রোত্র এ বলা হয়

লক্ষ্মীঃ শ্রীঃ কমলা বিদ্যা মাতা বিষ্ণুপ্রিয়া সতী ।
পদ্মালয়া পদ্মহস্তা পদ্মাক্ষী পদ্মসুন্দরী ।।
ভূতানামীশ্বরী নিত্যা মতা সত্যাগতা শুভা ।
বিষ্ণুপত্নী মহাদেবী ক্ষীরোদতনয়া ক্ষমা ।।
অনন্তলোকলাভা চ ভূলীলা চ সুখপ্রদা ।
রুক্মিণী চ তথা সীতা মা বৈ বেদবতী শুভা ।।
এতানি পুন্যনামানি প্রাতরুথায় যঃ পঠেৎ ।
মহাশ্রিয়নবাপ্নোতি ধনধান্যকল্মষম্ ।।

শ্রী , কমলা বিদ্যা , মাতা , বিষ্ণুপ্রিয়া , সতী , পদ্মালয়া পদ্মহস্তা পদ্মাক্ষী পদ্মসুন্দরী , ভূতগণের ঈশ্বরী , নিত্যা , সত্যাগতা , শুভা , বিষ্ণুপত্নী , ক্ষীরোদ – তনয়া , ক্ষমা স্বরূপা , অনন্তলোকলাভা , ভূলীলা , সুখপ্রদা , রুক্মিণী , সীতা , বেদবতী – দেবীর এ সকল নাম । প্রাতেঃ উত্থান কালে যারা দেবীর এই পুন্য নামাবলী পাঠ করেন তারা বিপুল ঐশ্বর্য পেয়ে ধনী হয়ে থাকেন ।

অগ্নি পুরাণ মতে শ্রী বা লক্ষ্মী হলেন যজ্ঞবিদ্যা , তিনিই আত্ম্যবিদ্যা , যাবতীয় গুহ্যবিদ্যা ও মহাবিদ্যা ও তিনি ।

যজ্ঞবিদ্যা মহাবিদ্যা গুহ্যবিদ্যা চ শোভনা ।
আত্ম্যবিদ্যা চ দেবি বিমুক্তিফলদায়িনী ।।

দেবী ভাগবত মতে যে স্বর্গে তিনিই স্বর্গ লক্ষ্মী , রাজগৃহে তিনি রাজলক্ষ্মী , গৃহে তিনি গৃহলক্ষ্মী । তিনি শান্তা , দান্তা , সুশীলা , সর্ব মঙ্গলা , ষড়রিপু বর্জিতা ।

এক কথায় ধন , জ্ঞান , শীল – তিনেরই বিকাশ দেবী লক্ষ্মীর মধ্যে । কমলের মতো তিনি সুন্দরী , কমলাসনে তাঁর নিবাস । কমল বা পদ্ম হল বিকাশ বা অভ্যুদয়ের প্রতীক । 

পুরানে আছে সাগর মন্থন কালে দেবী লক্ষ্মী সমুদ্র থেকে প্রকট হন । সাগর হল লক্ষ্মী দেবীর পিতা । সাগরেই মুক্তা , প্রবাল আদি রত্ন পাওয়া যায় । রত্ন হল ধন , যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন লক্ষ্মী ।
তিনি বিষ্ণুপ্রিয়া । তিনি শ্রী বিষ্ণুর সহধর্মিণী । তিনি সীতা , তিনি রাধা তথা রুক্মিণী । তিনি মহাপ্রভুর সহধর্মিণী লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী । তিনি ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের সহধর্মিণী মা সারদা । শরত ঋতু তে আমরা যে দুর্গাদেবীর পূজো করি তিনিও মহালক্ষ্মী স্বরূপা । দেবী লক্ষ্মী মহামায়া আদিশক্তির এক অংশ ।

দেবী লক্ষ্মী কে চঞ্চলা বলা হয় । কারণ লক্ষ্মী দেবী নাকি এক জায়গায় থাকেন না । ধন হস্তান্তর হয় । কুপাত্রের হাতে বিপুল ধন আসলে সে ধনের অসৎ প্রয়োগ করে লক্ষ্মী কে হারায় । রাবণ লক্ষ্মী সীতা দেবীকে অসৎ উপায়ে ভোগ করতে চেয়েছিলেন , এই কারনে গোটা লঙ্কা ধ্বংস হয়েছিল । রাবন নিহত হয়েছিলেন । এই থেকে আমরা শিক্ষা লাভ করি লক্ষ্মীর কৃপা সব সময় এ শুভ কাজেই ব্যবহার করা উচিৎ । এবং কখনো অসৎ উপায় অবলম্বন করে লক্ষ্মী প্রাপ্তির আশা করা উচিত নয় । না হলে রাবনের মতো আমাদেরও বিনাশ নিশ্চিত ।

দেবী লক্ষ্মীর নিবাস কোথায় ? তিনি কি খালি বৈকুন্ঠে শ্রী বিষ্ণুর পাদপদ্মে থাকেন ?

যেখানে শীল ও সদাচার থাকে দেবী সেখানেই বাস করেন । ব্রহ্ম বৈবরত পুরানে দেবী নিজ পরিচয় দিয়েছেন
“ যে সকল গৃহে গুরু , ঈশ্বর , পিতামাতা , আত্মীয় , অতিথি , পিতৃলোক রুষ্ট হন , সে সকল গৃহে আমি কদাপি প্রবেশ করি না । আমি সে সকল গৃহে যেতে ঘৃনা বোধ করি , যে সকল ব্যাক্তি স্বভাবতঃ মিথ্যাবাদী , সর্বদা কেবল ‘নাই’ , ‘নাই’ করে , যারা দুর্বলচেতা এবং দুঃশীল । যারা সত্য হীন , মিথ্যা সাক্ষ্য দান করে , বিশ্বাসঘাতক , কৃতঘ্ন , যে সকল ব্যাক্তি সর্বদা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত , ভয়গ্রস্ত , শত্রু গ্রস্ত , ঋণ গ্রস্ত , অতি কৃপণ , দীক্ষা হীন , শোকার্ত , মন্দঘ্নী , স্ত্রী বশীভূত , কুলটার পতি , দুর্বাক , কলহ পরায়ণ , যারা ভগবানের পূজো ও তাঁর নাম গুন কীর্তনে বিমুখ , যারা শয়নের পূর্বে পাদপ্রক্ষালন করে না , নগ্ন হয়ে শয়ন করে , বেশী ঘুমায় , প্রভাতে সন্ধ্যায় দিবসে নিদ্রা যায় , যাদের দন্ত অপরিচ্ছন্ন , বসন মলিন , মস্তক রুক্ষ , হাস্য বিকৃত , তাদের গৃহে আমি কদাপি গমন করি না ।

আমি সে সকল গৃহে বসতি করি , যে সকল গৃহ শ্বেত পারাবত অধুষ্যিত , যেখানে গৃহিণী উজ্জ্বল সুশ্রী , যেখানে কলহ নাই , ধান্য সকল সুবর্ণ সদৃশ , তণ্ডুল রজতোপম এবং অন্ন তুষহীন । যে গৃহস্থ পরিজনের মধ্যে ধন ভোগ্য বস্তুর সমান বিভাগ পূর্বক বিতরণ করেন , যিনি মিষ্টভাষী , বৃদ্ধপোসেবী , প্রিয়দর্শন , স্বল্পভাষী , অ দীর্ঘ সূত্রী , ধার্মিক , জিতেন্দ্রিয় , বিদ্যা বিনয়ী , অ গর্বিত , জনানুরাগী , পরপীড়ন বিমুখ , যিনি ধীরে স্নান করেন , চয়িত পুস্প আঘ্রাণ করেন না , সংযত এমন ব্যাক্তি আমার কৃপা পেয়ে থাকেন । ”

শুধু অর্থ নয় , উন্নত চরিত্রও মানুষের অমূল্য সম্পদ । লক্ষ্মী দেবীর কৃপা তাঁরাই লাভ করেন যারা নৈতিক চরিত্রের অধিকারী । লক্ষ্মী র কৃপা সব সময় সৎ কাজেই ব্যাবহার করা উচিত । মানুষ যদি লক্ষ্মী র অপপ্রয়োগ করেন ত অলক্ষ্মীর শাপে সে ধ্বংস হবেই । যে শুদ্ধ নৈতিক চরিত্রের অধিকারী তাঁর গৃহে লক্ষ্মী অচলা হয়ে অবস্থান করেন । আর যারা ঠিক এর উল্টো তারা কর্মদোষে অলক্ষ্মীর আহ্বান করে ধ্বংসের পথে অগ্রসর হয় । লক্ষ্মী হল ‘শ্রী’ । সকল নারীর মধ্যে যে শীল ও সদাচার আছে তার মাধ্যমেই তিনি প্রকাশিতা । তাই যেখানে নারী দের প্রতি অবমাননা হয় , বা যারা নারী দের ওপর নির্যাতন করেন – সেই সব জায়গায় কখনই দেবী লক্ষ্মীর কৃপা বর্ষণ হয় না ।

কথিত আছে কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার দিন দেবী রাত্রে খোঁজ নেন – কে জেগে আছেন ? যে জেগে অক্ষক্রীড়া করে , লক্ষ্মী তাঁকে ধন সম্পদ দান করেন ।

নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ জাগরত্তীতিভাষিণী ।
তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ ।।

অক্ষক্রীড়া শব্দের সাধারন অর্থ পাশা খেলা । এক শ্রেনীর লোক এই দিন পাশা খেলার মাধ্যমে টাকা পয়সা বাজি রেখে জুয়া খেলায় মেতে ওঠে । আবার কেউ কেউ এই দিন পরের বাগানের ফলমূল চুরি করে গাছপালা তছনছ করে । এই সব অর্থহীন কাজের মাধ্যমে তারা ভাবে যে লক্ষ্মী দেবী তাদের কৃপা করবেন ।
‘অক্ষ’ শব্দটির অনেক রকম মানে হয় । অক্ষ শব্দটির দ্বিতীয় অর্থ – ক্রয় বিক্রয় চিন্তা । যারা বৈশ্য তাঁরা এইদিন দেবীর আরাধনা করে ব্যবসা বাণিজ্যের চিন্তন করেন । দেবীর কৃপা পেলেই ত ব্যবসায় সফলতা আসবে । ‘অক্ষ’ শব্দটির আরেক ভাবে রুদ্রাক্ষ , জপমালা কেউ বোঝায় । যারা ভক্ত মানুষ – তাঁরা এই রাত্রে দেবীর কৃপা পাবার আশায় তাঁর নাম জপ করেন । ধন সম্পদ বলতে শুধু কি অর্থ , সোনা দানা ? বৈকুণ্ঠ ধাম , শ্রী বিষ্ণুর পাদপদ্ম পরম ধন । লক্ষ্মী পূজোর রাত্রে দেবী আসেন মর্ত্যলোকের দ্বারে দ্বারে । কিন্তু যে ঘুমিয়ে থাকে তার দ্বার থাকে লক্ষ্মী দেবী চলে যান । কিন্তু যিনি জেগে ভক্তি চিত্তে লক্ষ্মী জনার্দনের উপাসনা , নামস্মরণ করেন – দেবী তাঁকেই কৃপা করেন ।

পেঁচক মা লক্ষ্মীর বাহন । ধান হল লক্ষ্মীর প্রতীক । চাল , অন্ন , খাদ্যশস্য হল লক্ষ্মীর প্রতীক । তাই যারা খাদ্য অপচয় করেন , তাঁদের ওপর দেবী লক্ষ্মী কখনোই তুষ্ট হন না । ধানক্ষেতের আশেপাশে মূষিক এর বাস । এবং এরা ধানের ক্ষতি করে থাকে । পেঁচক এর আহার হল এই মূষিক । গোলাঘর কে লক্ষ্মীর প্রতীক বলা হয় । গোলাঘরের আশেপাশে মূষিক কূলের নিবাস । পেচক এই মূষিক দের ভক্ষণ করে খাদ্যশস্য কে রক্ষা করে । তাই এদিক থেকে পেঁচক মা লক্ষ্মীর বাহন হিসাবে যথার্থ মানানসই ।

পেঁচক দিনে অন্ধ । সে রাত্রে জাগে । তাই আমরা যেনো পরধন সমন্ধে তেমন অন্ধ হই । কখনো যেনো অন্যের ধন আত্মস্যাৎ করার ইচ্ছা মনে না জাগে ?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন

যা নিশা সর্বভূতানাং সা নিশা জাগরতি সংযমী ।
যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশাতো মুনেঃ ।।

অর্থাৎ সর্ব ভূতের যা রাত্রি , সংযমীর পক্ষে তা দিন । তাঁদের যা দিন , তাঁর তা রাত্রি । সকল প্রানী পরমার্থ বিষয়ে নিদ্রিত কিন্তু বিষয়ভোগে জাগ্রত । কিন্তু সংযমী সাধু যোগী পরমার্থ বিষয়ে জাগ্রত , বিষয়ভোগে নিদ্রিত । দেখা যায় দিবাকালে অন্য প্রাণীরা যখন জাগ্রত পেচক তখন নিদ্রিত । পেচক নিশাচর । নিশীথের নিস্তব্ধ পরিবেশ সাধুদের সাধনার অনুকূল । তাই পেচক আমেদের পরমার্থ চিন্তার আদর্শ সেখায় , যার মাধ্যমে আমরা দেবীর কৃপা পেতে পারি ।

আসুন আমরা সকলে কোজাগরী পূর্ণিমার শুভ তিথিতে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় ব্রতী হই ।

এই বিভাগের আরো সংবাদ