[bangla_day], [english_date], [bangla_date], [hijri_date], [bangla_time]

আমরা কি ডিজিটাল আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছি?

প্রকাশঃ May 7, 2016 | সম্পাদনাঃ 7th May 2016

dilruba_112014

‘নাহ লারনেড! শিক্ষকদের জন্য জামিন চাইবেন না’ মহামান্য বিচারপতির মুখে এহেন কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়ি বৈকি! সাথে সাথে মনে পড়ে যায় অগনতি আলোকিত শিক্ষকের মুখ! যাদের জন্য আজ আমি এখানে এসে দাঁড়াতে পেরেছি! প্রাণপ্রিয় স্যারদের চেহারা যখন মনে পড়ে তখনই কেবল আমার মস্তিষ্কে অক্সিজেন চলাচল আবার শুরু হয়।

আমাদের ছেলেবেলায় শিক্ষক মানে ছিলেন গুরু। বাবা-মায়ের পরেই শিক্ষকের স্থান। শিক্ষক কেবল আমাদেরকে ক্লাসের পড়াই পড়াতেন না। আমাদের জীবনে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করতেন। আমাদের গাইড ছিলেন। ছিলেন ‘ফিলোসফার’। শিক্ষক মানেই ছিলেন জীবনের আর একটি নির্ভরতার জায়গা! যেখানে বিনা স্বার্থে সবকিছুই বলা শেয়ার করা যায়।

আমাদের সময় প্লে গ্রুপ এর নামে এক বোঝা লেখাপড়ার দায়ভার ছিল না। যদি কোনো পরিবার বাচ্চাকে ওয়ান টু বাসায় পড়িয়ে দিতেন তো স্কুলিং শুরু হতো ক্লাস থ্রি থেকে। আমার স্কুলিং শুরু হয়েছিল ক্লাস টু থেকে। কী অভূতপূর্ব সেই অনুভূতি! স্কুল–টিচার– ফ্রেন্ডস! চমৎকার গান গাইতেন আমার ক্লাসের এক শিক্ষিকা। কী যে প্রিয় ছিলেন তিনি আমার! প্রায়ই আমার হাত ধরে বাসায় চলে আসতেন। আমার মায়ের সাথে তার যত সখ্য। পরে জেনেছি তিনি ১৯৭১ এ তার স্বামী–ছেলে–মেয়ে সব হারিয়েছেন! অথবা ভুলি কেমন করে পি টি আই স্কুলে ভর্তি হবার সময় যিনি আমার মৌখিক পরীক্ষা নিয়েছিলেন সেই শুভ্র চুলের রবিউল স্যারকে? যাদের চেহারা মনে পড়লে আজও শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়ে আসে!

ক্লাস থ্রিতে মা আমার স্কুল পরিবর্তন করে দিল উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে।  কী মন খারাপ আমার পি টি আই স্কুলের শিক্ষকদের জন্য! তারপর দীর্ঘ সময় এই সরকারি উচ্চ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়া! যেদিন এসএসসি’র ফেয়ার ওয়েল পার্টি হলো, মনে হলো সব যেন শেষ আমার। জানতাম যে, বন্ধুদের সাথে ঘুরে ফিরে দেখা হবে। কিন্তু আমার প্রিয় শিক্ষকদের সাথে? আজও যশোর গেলে সেই পি টি আই স্কুলে, হাইস্কুলে, কলেজে ফিরে ফিরে যাই শ্রদ্ধা জানাতে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো আমার ফাউন্ডেশন তারপর যত বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই আমি পড়ার সুযোগ পাই না কেন এরাই আমার ভিত্তি! এই শিক্ষকেরাই আমার সবকিছু।

ফেয়ার ওয়েলে আমাদের আর শিক্ষকদের চোখের পানি সব মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। সেই প্রাণপ্রিয় শিক্ষক হাসিনা আপা, কোহিনূর আপা বা মতিন স্যার অথবা জয়েনুদ্দীন স্যার অথবা মোহসিন স্যারকে আজও মনে করি! ঝুনু আপা বা লছমি আপা ছাড়া কি আমি নিজেকে আবিষ্কার করতে পারতাম যে, আমি গাইতে পারদর্শী না নাচে, বা আসলেই কি অভিনয় জানি? স্কুলের বড় আপা (প্রধান শিক্ষক) আর মেজ আপা (সহকারী প্রধান শিক্ষক) তাদের সবার হৃদয়ের উঞ্চতায়ই তো কেটেছে স্কুল জীবন! এমনকি স্কুল গেটের ছোটখাটো দারোয়ান ভাইটাও ছিলেন আমাদের অভিভাবক!

যশোর সরকারি মহিলা কলেজেই আমার রাজনৈতিক জীবনের আত্মবিকাশ! কী অদ্ভুত ছিল সেই সময়টা! কোনো দলের পরিচয় না একাত্মতা ছিল ছাত্রীদের মঙ্গলের জন্য, কল্যাণের জন্য, কলেজের উন্নতির জন্য। এবং এই দুই বছর যেন কেটেছে একটি ঘোরের মাঝে, স্বপ্নের মাঝে, ঝড়ের বেগে। সময় খুব কম তাই অশোকা আপার সাথে সাংস্কৃতিক কাজে, ফসিউজ্জামান স্যারের সাথে খেলার মাঠে, হান্নান স্যারের সাথে ইনডোর গেমসে বা নাঈম স্যারের সাথে লাইব্রেরিতে সাহিত্যের তুমুল বিতর্কে! লজিক পড়াতেন স্যার আমিনুল ইসলাম। তার সাথে লজিকের বিভিন্ন থিউরি নিয়ে এমনই মজায় সময় কাটতো যে, স্যার তখনই ভবিষ্যৎবাণী করে দিলেন, তুমি আইনজীবীই হবে। এরা কেবল আমাদের শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন আমাদের বন্ধু, গাইড, ফিলোসফার আমাদের পিতার অধিক!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হওয়া যতটা আমার মায়ের ইচ্ছা ছিল তারচেয়ে অধিক ভাইভা বোর্ডের স্যারদের। আসলে আজ আমি আইনজীবী না হলে কী হতাম? কী যোগ্যতা ছিল আমার আর কিছুই হবার?

মেধা ছিল না পর্যাপ্ত তাই অনেক পরিশ্রম করেই আমাকে সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় যখন খুবই ভালো করলাম তখন ভাইভা বোর্ডের স্যাররাই আমার সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলে ঠিক করে দিলেন তুমি আইন নিয়ে পড়। আমি কৃতজ্ঞ সেই স্যারদের কাছে যারা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাদের সব স্নেহ-মায়া-মমতা-ভালোবাসা দিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা খুব নিরঝঞ্ঝাট ছিল না। সেই সময় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (হাবিব–অসীম) এর অস্তিত্ব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিল না বলা যায়। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রাজনীতি করা, মিছিল মিটিং করা , নির্বাচন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। তার ওপর ছিল হলে ও ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক দল করা, নানা কিছুর সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখা খুব সহজ কিছু ছিল না। কারণ ভৌগলিক কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গ্রামমুখী। তারপরও আমরা খুব ভালোই ছিলাম, কারণ আমাদেরকে ঘিরে ছিলেন পূর্ব ও পশ্চিমপাড়ার শিক্ষক ও তাদের পরিবার পরিজন। তারাই ছিলেন আমাদের অতন্দ্র প্রহরী!

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি সি রকিব স্যার ছিলেন ভিন্ন মত পথের মানুষ, কিন্তু তারপরও নানা সংকটে তার কাছে ছুটে গিয়ে সহায়তা পাইনি এমনটি ঘটেনি। অথবা প্রক্টর ফারুকী স্যার? তখন প্রোভিসি আমানউল্লাহ স্যার? হলের প্রভোস্ট হোসনে আরা আপা, তাসকীনা ফারুক আপা, মাসতুরা খানম আপা? কে আগলে রাখেননি আমাদের বন্ধুর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন? সংকটে– দুর্যোগে এরাই তো ছিলেন পরমাত্মীয়!

আমার চলমান স্বভাব আমাকে কেবল মমতাজউদ্দীন কলা ভবন এর আইন বিভাগেই বন্দী করে রাখতে পারেনি। আমি ছুটেছি মমতাজউদ্দীন থেকে শহীদুল্লাহ কলা ভবন –রবীন্দ্র বাণিজ্য ভবন থেকে সায়েন্স ফ্যাকাল্টি! কারণ সব জায়গায়ই ছিল আমার প্রিয় স্যার–আপারা। যাদের কথা আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম! শহীদুল্লাহ কলা ভবনে এক অদ্ভুত আকর্ষণ ইংরেজি সাহিত্যের দিকপাল আলী আনোয়ার স্যার চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যেতেন তার ক্লাসে! এদিকে হাসান আজিজুল হক স্যার, সনত সাহা দা, মলয় ভৌমিক দা, সজল চক্রবরতী দা,  শিশির ভট্টাচার্য দা, সুব্রত মজুমদার দা কে নয়?

প্রত্যেক স্যার ছিলেন একেকটি জ্ঞানের সম্ভার। অঞ্চলগত কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। শিক্ষকদের আবাসস্থলের জন্য পূর্বপাড়া আর পশ্চিমপাড়ার সূক্ষ্ম তফাৎ, আদি হল আর নব্য হলের সূক্ষ্ম বিভাজন! ছেলেদের হল আর মেয়েদের হলের নীতি নিয়মের বৈষম্য। শহরের  ছাত্র/ছাত্রী আর হলের ছাত্র ছাত্রীর মাঝে চিন্তা চেতনার এক ব্যাপক পার্থক্য অনেক সময়ই প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতো! এর বাইরে শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতবাদের পার্থক্যও ছিল। ছিল রবীন্দ্র গ্রুপ, আওয়ামীপন্থী, চীনপন্থী, বাম রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী, ছিল চরমপন্থী, জামাত গ্রুপ, বিএনপিপন্থী। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, শিক্ষকেরা  যে গ্রুপের হোক না কেন যখনই আমরা কোনো ঝামেলায় পড়েছি কোনো না কোনো শিক্ষকের কাছেই  আশ্রয় পেয়েছি। তারা যেন আমাদেরকে আশ্রয় দেবার জন্য, সাহস দেবার জন্য হাত বাড়িয়েই রয়েছেন। আমরা সবাই তাদের সন্তান, ভাই, বন্ধুতুল্য! আমাদের শিক্ষকেরা যে আমাদের কাছে কতটা আপন ছিলেন আর কতটা নির্ভরযোগ্য জায়গা ছিলেন সেটা হয়তো আজ কাউকেই বোঝাতে পারবো না! আফসোস!

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের উঠকো ঝামেলার শেষ আশ্রয় ছিলেন আমাদের টিচাররা। এক অদ্ভুত রকমের মানুষ ছিলেন তারা। কারো সততা কারো চেয়ে কম ছিল না। প্রচারবিমুখ, উদারমনা এই মানুষগুলো একেকটি  বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডারের আধার ছিলেন। স্যাররা কেবল ক্লাসই করাতেন না জীবন গঠনের দিকনির্দেশ দিতেন।  আমরাও শিক্ষকদের রায়ই চূড়ান্ত মনে করতাম। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যে কত মধুর আর নিবিড় সেটা আমরা জানি।

যেকোনো দুর্যোগ মানেই শিক্ষকেরাই আমাদের শেষ ভরসা। এই বিষয়টা একতরফা কোনোদিনই হয় না বা হওয়া সম্ভব না। আমরাও আমাদের শিক্ষকেরা যৌথভাবেই তৈরি করেছিলাম এই ক্ষেত্র! আমরা ছিলাম একে অপরের সম্পূরক ও পরিপূরক!

আজ কতই না বদলে গিয়েছে চিত্র! কে, কিভাবে বদলে দিল জানি না! তবে আজ পড়ি শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পরক নিয়ে প্রশ্ন উঠে, ছাত্রী ধর্ষণ হয় বা শিক্ষককে হুমকি-ধামকি দেয়া হয়, সময়-বিশেষে শিক্ষকের গায়ে হাত তোলাও হয়, শেষ হলো শিক্ষক হত্যার মাঝ দিয়ে!  কিভাবে সম্ভব? ‘শিক্ষক’ সেতো গুরুজন। যার কাছেই ছাত্রের ভবিষ্যৎ! যার দেখানো, শেখানো পথেই আমাদের জয়যাত্রা। তাকে/তাদেরকে আমরা অসম্মানিত করি কিভাবে? হত্যা করি কিভাবে? আজও আমার সংগ্রহে রয়েছে প্রিয় স্যার হাসান আজিজুল হকের লেখা সেই দুই লাইন ‘প্রিয় সুস্মিতা, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না তাই তোমার আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারলাম না। দুঃখিত, ক্ষমা করে দিও।“ ক্ষমা? স্যারের এই চিঠি পেয়ে হলের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ফেলে ছুটে গিয়েছিলাম, স্যার, আপনি কেমন আছেন? আমার ভেজা চোখ দেখে স্যার নিজেও বিব্রত! খানিক তা লজ্জিত! এই পরম স্নেহ, অসীম ভালোবাসা, নির্ভরযোগ্য আশ্রয় বাবা মা ছাড়া আর কোথায় পেয়েছি আমরা? শিক্ষকদের কাছে।

আফসোস! আজ সেই দিনগুলি কোথায় হারিয়ে গেল? কেন আজ শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন মামলা হয় যার জন্য উচ্চ আদালতে শিক্ষকের জন্য জামিন চাইতে গেলে মহামান্য বিচারপতির কাছে শুনতে হয়, ‘লারনেড, প্লিজ শিক্ষকদের জন্য জামিন চাইতে আসবেন না!’ কেন আজ ছাত্রীরা শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্লীনতাহানির অভিযোগ তুলতে পারে?  কিভাবে বদলে গেল ছাত্র-শিক্ষকের গৌরবময় ইতিহাস? ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক যদি এই হয় তবে আমাদের ভবিষ্যৎ কী? আমরা কি ডিজিটাল আঁধারেই ডুবে যাচ্ছি?

দিলরুবা শরমিন: আইনজীবী মানবাধিকার কর্মী

এই বিভাগের আরো সংবাদ